21.7 C
Rangpur City
Tuesday, November 29, 2022

বিলীন হচ্ছে একের পর এক গ্রাম, বদলে যাচ্ছে মানচিত্র :সারা বছরই ভাঙনের কবলে কুড়িগ্রাম

-- বিজ্ঞাপন --

সারা বছরই নদ-নদীর তীব্র ভাঙনে দেশের বৃহত্তম নদ-নদীর কুড়িগ্রাম জেলা এখন হুমকির মুখে। প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে একের পর গ্রাম। দিন যত যাচ্ছে নদ-নদীর ভাঙনে গৃহহীন হয়ে পড়ছে হাজারও পরিবার। সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পাশাপাশি কর্মহীন হয়ে পড়ছে মানুষ। বদলে যাচ্ছে জেলার মানচিত্রও। ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন কুড়িগ্রামবাসী।

কুড়িগ্রামে ১৬টি নদ-নদীতে ৩১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীপথ রয়েছে। এসব নদ-নদীর তীরে রয়েছে পাঁচ শতাধিক চরাঞ্চল। নদ-নদীর পানি বাড়া-কমার সঙ্গে ভাঙনও অব্যাহত থাকে। বন্যার পানি কমা-বাড়ার সঙ্গে তিস্তা, ধরলা, গঙ্গাধর, দুধকমুার নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হচ্ছে একের পর এক গ্রাম। ভাঙনে আবাদি জমি, কাঁচা-পাকা সড়ক, মসজিদ ও গাছপালা এবং সরকারি-বেসরকারি অনেক স্থাপনা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে নদীর তীরবর্তী পরিবেশ হচ্ছে বেদনাবিধুর। আকাশের নিচে ঠাঁই নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে ভাঙনকবলিতদের। ঘরবাড়ি আর সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে শত শত পরিবার।

-- বিজ্ঞাপন --

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ফকিরপাড়ার বাসিন্দা আফিয়া বেওয়া বলেন, ‘বেশ কিছুদিন হইল দুধকুমার নদীতে ঘরবাড়ি ভাঙ্গি গেইছে। কিছু জিনিস সরবার পাইলেও অনেক জিনিস ভাসি গেইছে। সেই কি নদীর ভাঙন! চোখের পলকে সব ভেসে গেইলো।’

একই এলাকার সোলায়মান আলী বলেন, ‘মাস দেড়কের মধ্যে ফকিরপাড়া আর মুন্সিপাড়া বিলীন হয়া গেইছে। প্রায় তিন-চার শ পরিবার নিঃস্ব। এমারগুলার থাকারও জায়গা নাই। যে যেখানে পাইছে আশ্রয় নিছে। এলা হামার কাজ নাই, হাতত টাকা নাই। হুঁ-হুঁ করি জিনিসপত্রের দাম বাড়বাইছে। এলা এই মানুষগুলা বাড়ি করবে না প্যাট বাঁচাইবে?’

-- বিজ্ঞাপন --

নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া ইউনিয়নের ব্যাপারীর চর গ্রামের বাসিন্দা ৭০ বছরের সিফাত উল্লাহ জানান, তার পূর্বপুরুষ এই চরে বসতি স্থাপন করে। শত বছরের বেশি সময় ধরে তাদের বসবাস এখানে। হঠাৎ করে গত বছর চরটি দুধকুমার নদীর ভাঙনের মুখে পড়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধ করলেও এর আগেই ভাঙনে সবকিছু হারিয়েছে ১৫টি পরিবার।

চর নেওয়াজী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়টি নদীভাঙনের হুমকির মুখে। আমি ওপর মহলে কথা বলেও কোনো সাড়া পাচ্ছি না। এখন কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না, কী করব।’

-- বিজ্ঞাপন --

এ বিষয়ে মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য শাহ আলম বলেন, ‘ঢাকাইয়া পাড়ায় যে বাড়িগুলো ভেঙে গেছে তারা কয়েক দফায় ভাঙনের শিকার হয়ে এই এলাকায় বসতি গড়ে। কিন্তু সেটিও এখন ভেঙে গেল। বর্তমানে এদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৬টি নদ-নদীর ৩১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে রয়েছে কুড়িগ্রামে ৯টি উপজেলা, তিনটি পৌরসভা ও ৭৩টি ইউনিয়ন। এর মধ্যে ৫৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা ভাঙনের শিকার হয়েছে। আর শতভাগ ভাঙনকবলিত হয়েছে দুটি উপজেলা- চিলমারী ও রাজীবপুর। জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি বিছিন্ন হয়েছে আটটি ইউনিয়ন। আর প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাধিক চরাঞ্চলে বসবাস পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পৌরসভা, কাঁঠালবাড়ী, হলোখানা, পাঁচগাছি, যাত্রাপুর, মোগলবাসা, ঘোগাদহ ও ভোগডাঙ্গা। নাগেশ্বরী উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে রায়গঞ্জ, বামনডাঙ্গা, কেদার, কালিগঞ্জ, বল্লভেরখাষ, কচাকাটা, নারায়ণপুর, বেরুবাড়ি, নুনখাওয়া ইউনিয়ন দুধকুমার, গঙ্গাধর ও ব্রহ্মপুত্র নদ ভাঙনের শিকার। ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে দুধকুমার নদের ভাঙনে শিলখুড়ি, তিলাই, বলদিয়া, চরভূরুঙ্গামারী, পাইকারছড়া, বঙ্গসোনাহাট ও আন্ধারীঝাড় ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উলিপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পড়েছে হাতিয়া, বুড়াবুড়ি, তবকপুর, বজরা, থেতরাই, গুনাইগাছ, বেগমগঞ্জ ও সাহেবের আলগা।

ফুলবাড়ির ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে ধরলা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে নাওডাঙ্গা, শিমুলবাড়ী, ফুলবাড়ী সদর, বড়ভিটা ও ভাংগা মোড়। রৌমারী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদ ও জিঞ্জিরাম নদীর ভাঙনের মুখে বিলীন হচ্ছে বন্দবের রৌমারী সদর, যাদুরচর ও চর শৌলমারী ইউনিয়ন। রাজীবপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন কোদালকাটি, মোহনগঞ্জ ও রাজীবপুর সদর ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত।

চিলমারী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের অষ্টমীর চর, নয়ারহাট, চিলমারী সদর, থানাহাট, রমনা ও রানীগঞ্জ ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর রাজারহাট উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে রয়েছে তিস্তা ও ধরলা নদীভাঙনের শিকার ঘড়িয়ালডাঙ্গা, ছিনাই, বিদ্যানন্দ ও নাজিম খাঁ ইউনিয়ন।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কুড়িগ্রামে প্রায় ২০ কিলোমিটার ভাঙনকবলিত হয়েছিল। এর মধ্যে আমরা প্রায় আট কিলোমিটার নদীর ভাঙনরোধে কাজ করতে পেরেছি। এ ছাড়া ধরলা ও দুধকুমার নদীতে ড্রেজিং করার জন্য একটি সমীক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

-- বিজ্ঞাপন --

Related Articles

Stay Connected

82,917FansLike
1,610FollowersFollow
752SubscribersSubscribe
-- বিজ্ঞাপন --

Latest Articles